Brook Preloader

Blog

পানিশূন্য পৃথিবীতে একদিন!

সাল ২০৭৩। আপনি বড় বড় পানির পাত্র নিয়ে অপেক্ষা করছেন কখন বাস আসবে। আপনার এলাকায় এখনও পাকা রাস্তা আছে, গণ হাম্মামখানা, গণ সৌচাগার আছে, আর আছে সপ্তাহে দুই দিন সুপেয় পানির সরবরাহ। অধিকাংশ অন্যান্য এলাকাতে এই সুযোগ সুবিধাগুলো আর চালু নেই। বাসটা ঘুরে বাজারের পথে ঢুকতেই আপনার চোখ পড়লো পানিবাহী গাড়িটার দিকে। গাড়িটা তার নির্দিষ্ট স্থানে  এসে থামার আগেই এলাকার মানুষ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে গেছে পানি সংগ্রহ করতে। লোকালয়ের যে অল্প কিছু শিশু এখনো বেঁচে আছে, তারা পানির ট্যাংক ঘিরে হৈ হল্লা করছে। এখন আর ঘরে ঘরে শিশু নেই। নগরীর পর নগরী এখন কলেরাক্রান্ত, ডায়ারিয়া হচ্ছে হরহামেশাই। বিশ্বে গড়ে এক জন শিশু মারা যায় পানিশুন্যতায়, দুই জন পানিবাহিত রোগে। তার তুলনায় আপনার এলাকাবাসী অন্তত বিশুদ্ধ পানি পান করে বেঁচে থাকতে পারছে। টিকে থাকার লড়াই আপনাকে নিয়ে এসেছে পৃথিবীর এই প্রান্তে, আপনার পৈত্রিক ভিটে তো বন্যায় তলিয়ে গেছে সে কবেই।

দুঃখজনক ব্যাপার হল এই বিভিষিকাময় চিত্র সম্পূর্ণ কল্পণাপ্রসূত না। বিশ্বের ৮৪৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য বাস্তবতা কমবেশি এমনই। আপনি যদি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন হন যার কিনা পানি পেতে শুধু একটা কল খুলতে হয়, তবে আপনার জন্য পৃথিবীর বাকি মানুষদের দৈনন্দিন জীবনের চিত্র তুলে ধরতে চাই। প্রতিদিন নারী ও কিশোরীরা সামষ্টিকভাবে ২০০ মিলিয়নেরও বেশি ঘন্টা ব্যয় করে শুধু বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে। বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ মানুষের কোন স্বাস্থ্যসম্মত সৌচাগার নেই। গড়ে প্রতি দুই মিনিটে একটি ৫ বছর বা তার কম বয়সী শিশু মারা যাচ্ছে পানিবাহিত রোগে। পানি যদি বর্তমান হারেই খরচ হতে থাকে, তবে দশ বছর পর পৃথিবীতে আমাদের প্রয়োজনের শুধুমাত্র ৬০% পানি থাকবে। এখন থেকে বিশ বছর পর পৃথিবীর সকল মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর পানিই থাকবে না। তারও দশ বছর পর, ২০৫০ সালে খরাকবলিত স্থলভূমির পরিমান বাড়বে ৫ গুণ, তীব্র পানি সংকটে পড়বে ৫ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ।

এই ভয়াবহ তথ্যাবলী আমাদের কাছে থাকা সত্ত্বেও, পৃথিবীতে পানির অপচয় চলছে আপন গতিতে। বিজ্ঞানীরা বারংবার সাবধানী বাণী শুনিয়েছেন বিশ্বনেতাদের। বিবিধ বৈশ্বিক অধিবেশনে পলিসি দাঁড় করানো হয়েছে। কিন্তু যে নিদারুন পানি সংকটের দিকে আমরা ধাবমান, তা ঠেকাতে তৃণমূল পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য আন্দোলন হচ্ছে তা বলা যায় না। আমরা এখন শৌচকর্মটাও করি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, গোসলের সময় পানি ছেড়ে গান ধরি; আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে পদে পদে পানি অপচয় করে যাই নিজের অজান্তেই। আমাদের বর্জ্য আমরা নিশ্চিন্তে ঢেলে দিচ্ছি জলধারায়, দূষণ ও খরায় নদী-নর্দমা আলাদা করা যায় না। তারপরও আমরা  প্রকৃতি ও বাস্তবতা থেকে আমরা যতই বিছিন্ন হয়ে পড়ি, ততই হুহু করে নেমে আসে পানির স্তর, তীব্র পানি সংকট ধেয়ে আসে আমাদের দিকে।

যখন খরাক্রান্ত স্থলভূমির মানুষ পানিশূন্যতায় ভুগছে, তখন বাকি আরও অনেক দেশের জনতা চালাচ্ছে বন্যায় টিকে থাকার লড়াই। বঙ্গোপসাগরকে বুকে নিয়ে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল বাৎসরিক নিয়মে প্রবল বন্যা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রাম প্রতি বছর বিপুল বর্ষণে তলিয়ে যায়। শহরটির বাংলাদেশের একটি অন্যতম জরুরী যোগাযোগের পথ হলেও, একদিনের বর্ষণেই এলাকাগুলোর যোগাযোগ থমকে যায়। রাস্তা ডুবে যাওয়ায় বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ থাকে, অফিসে গিয়ে পানিবদ্ধ হয়ে সময়মতো বাসায় আসতে পারেন না চাকুরীজীবীরা। পাহাড় কেটে গড়া শহরটির নিচু অঞ্চলগুলোতে পানি জমে গিয়ে সংক্রামক রোগ ছড়াতে শুরু করে। চারদিকে ঘিরে থাকে পানি, অথচ অনুন্নত এলাকার মানুষেরা খাওয়ার পানি পায় না। এর চেয়েও ভয়াবহ চিত্র বরিশাল, খুলনা, সুন্দরবন অঞ্চলে। বরিশাল এলাকার মানুষেরা জলপ্লাবনে এতটাই অভ্যস্ত যে তারা কচুরিপানা এক করে তার উপর চাষাবাদ করা শুরু করেছে। বছর ঘুরে বারবার ফেরা বন্যায় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় দেশটিকে। শুধুমাত্র ২০১৭ সালেই ১৫ লাখ ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে আগ্রাসী বন্যা। নষ্ট হয়েছে ৪৫০০০০ হেক্টর চাষাবাদের জমি, যা ছাপিয়ে পুরোন অনেক ক্ষতির হিসেব। এক একবার বন্যায় মানুষ, গবাদি পশু, ফসল, জমি, ও ঘরবাড়ি, অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঢাকার পানি চাহিদার ৮৭ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি থেকে আসে। গত ৭ বছরে এই পানির স্তর বাৎসরিক ২.৮১ মি. হারে সর্বমোট ২০ মি. নিচে নেমেছে। বর্তমানের হারে পানি তুলতে থাকলে এই স্তর ২০৫০ সালের মধ্যে ১২০মি. বা তারও নিচে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আসুন একসাথে

বিশ্বময় ওয়াটার এইড, ক্লিন ওয়াটার একশন, চ্যারিটি : ওয়াটার – এর মত নানা সেচ্ছাসেবী সংস্থা পানি দূষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি করতে অবিরত কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু এখন সময় আপনার আর আমার এগিয়ে আসার। পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিভিন্ন সমাজের মানুষ একত্রিত হয়ে পানি সংকট মোকাবেলার চেষ্টা করেছে, এবং তারা গর্ব করে বলার মত সফলতাও পেয়েছে। তরুন ভারত সংঘের সহায়তায় ভারতে তৈরি হয়েছে “রাষ্ট্রীয় জল বিরাদারি”, যা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় রাষ্ট্রীয় জল সমাজ। ইতোমধ্যেই তারা দেশটির আনাচে কানাচে পানি সংকট সুরাহা করার উদ্যোগ নিয়েছে। গ্রামে গ্রামে তারা স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানি জমানোর ব্যবস্থা করেছে। নদীরক্ষা ও পানির বাণিজ্যিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সংঘ হয়ে উঠেছে তারা।

গত ২৬শে ফেব্রুয়ারী, আমেরিকার ওহাইও রাজ্যে একটি বিচিত্র বিলের উপর গণভোট সংগঠিত হয়েছে। ওহাইওর টলেডো এলাকার মানুষেরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তাদের নিকটবর্তী লেক ইরিকে আইনি অধিকার প্রদান করা হবে। বহু বছর ধরে এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতির মাশুল দিতে হয়েছে লেক ইরিকে, যার ফলে ঘন ঘনই লেকটির পানি দূষিত হয়ে পড়ে। সরকারি প্রয়াসে অসন্তুষ্ট টলেডোবাসীরা নিজেরাই লেকটিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। স্থানীয় পরিবেশগত প্রতিরক্ষা তহবিলের সাহায্য নিয়ে তারা একটি বিল গঠন করেন যা স্পষ্ট ভাবে বলে যে লেক ইরির বাঁচার, বাড়ার, ও প্রাকৃতিক নিয়মে বিকশিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। ২৬ তারিখ এই বিলটি পাশ হওয়ার ফলে এখন টলেডোবাসী লেক ইরির পক্ষ থেকে দূষণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের হাই কোর্টও নদীর পাড় ঘেষে গড়ে ওঠা লোকালয় অপসারণের নির্দেশ দেয়। সে ব্যাপারে গত ১০ বছরে কোন পদক্ষেপ দেখা যায় নি।

লেক ইরি একটি উদাহরণ মাত্র। ২০০৬ সালে প্রথমবারের মত একটি প্রাকৃতিক আধার আইনি অধিকার ভোগ করার অনুমতি পায়। পেনসিল্ভেনিয়ার একটি এলাকা প্রথমবারের মত এই আবেদনটি তুলে। সেই বিলটি পাশ হওয়া নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক ছিল। এর পরে একে একে আইনি অধিকার লাভ করেছে ইকুয়েডরের প্রাকৃতিক নিদর্শন। ভারত সরকার ঘোষণা দিয়েছে গংগা ও যমুনা নদীর পৃথক আইনি স্বত্তা আছে। একই প্রকার আইনি নিরাপত্তা পেয়েছে কলোম্বিয়ার রিও আত্রাতো নদী ও নিউজিল্যান্ডের ওয়াংঘানুই নদী।

বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষেরা সচেতন হয়ে তাদের পার্শ্ববর্তী জলভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসছে। আমরা সামাজিক ভাবে যদি সচেতন না হই, তবে শুধু সরকারী ও বেসরকারী সংস্থার উপর নির্ভর করে কোন সুদূরপ্রসারী সমাধানে আসা যাবে না। সচেতন এলাকাবাসী হিসেবে, পানিরক্ষার কাজে আপনাকেও অংশগ্রহণ করতে হবে। কিভাবে করবেন সে ব্যাপারে কিছু পরামর্শ –

  • মেরামত কাজে আলসেমী নয়। যখন সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিশুরা পানিস্বল্পতায় রোগবালাইর শিকার হচ্ছে, সেই একই সময় গ্যালন গ্যালন পানি আপনার বিল্ডিং-এর পাইপের ফাটা বেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিশাল পরিমাণ পানি ফাটা পাইপ আর ভাঙ্গা কল দিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার আগেই মেরামত কাজ সম্পন্ন করুন।
  • স্থানীয় ভাবে একটি আবর্জনা ফেলার স্থান নির্ধারণ করুন। সবসময় ময়লা একই জায়গায় ফেলুন বা ময়লা এলাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। সেটা অবশ্যই এলাকাভেদে ভিন্ন হবে। কিন্তু তার মূলমন্ত্র হবে আবর্জনা পানিতে বা তার আশেপাশে ফেলা রোধ করা।
  • নীতিমালায় পরিবর্তন আসা জরুরী। চোখ রাখুন আইনি ব্যবস্থায় কি নতুন পরিবর্তন আসছে তার উপর। ভারত তরুন সংঘ ও ওহাইওর টলেডোবাসি এর মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে জনগণ এগিয়ে আসলে ঠিকই প্রকৃতির স্বার্থরক্ষায় দেশের আইনি অবকাঠামোতে পরিবর্তন আনা যায়।
  • যা কিছু আমরা নেহাতই আমাদের জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে আসছি, তার মধ্য থেকে পরিবেশবিরোধী অভ্যাসগুলো খুঁজে বের করুন। যুগের পর যুগ আমেরিকানরা শিখে এসেছে আদর্শ ঘর মানে বাড়ির সামনে কচি ঘাসের লন। এই ঠুনকো নান্দনিকতা জিইয়ে রাখতে এক ঘন্টায় লনের ঘাসগুলোতে ১০২০ গ্যালন পানি অপচয় হয়।
  • লোকালয়ের সৌন্দর্যবৃদ্ধিতে ফোয়ারা না বানিয়ে, সেই জায়গায় বিশুদ্ধ পানির ভেন্ডিং মেশিন বসানো যায়। এতে নানাবিধ লাভ হবে। ফোয়ারার পানি খাওয়া যায় না, কিন্তু দুটো কয়েনের বদৌলতে আপনি আপনার পানির বোতলটি একবার ভরে নিতে পারবেন। বিশুদ্ধ পানি পান করার মাধ্যমে পানিবাহিত রোগগুলো এড়িয়ে যেতে পারবেন। আবার যন্ত্র থেকে পানি নিতে হলে সবাইকে নিজের বোতল সাথে রাখতে হবে। বোতলজাত পানির ব্যবহার কমে আসলে মহাসাগরে জমতে থাকা ব্যবহৃত বোতলের ঢিবিটা কিছুটা হলেও ছোট হবে।
  • গাছ আপনার বন্ধু। পরিবেশের পানির পরিমান সীমিত এবং একই পানি বারবার ঘুরে আসে। পানিচক্র চলমান রাখতে গাছের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। আমাদের ধূসর নাগরিক নকশায় আমরা পানি শোষণের কোন উপায় রাখি নি। অপরান্তে চায়না, জার্মানী ও অন্যান্য দেশে তৈরি হচ্ছে “স্পঞ্জ সিটি”। শহরের অব্যবহৃত জমি, দালানের ছাদ, বারান্দায় এবং অন্য যেখানেই সম্ভব, তারা ছোট ছোট গাছ রোপণ করছে যাতে বৃষ্টির সময় পানি শোষণ ও ধারণ করা যায়, যা পরবর্তীতে বাষ্প হয়ে প্রকৃতিতে ফিরে যাবে।

আপনি কি করতে পারেন?

বর্তমানে প্রতিদিন মাথা পিছু গড় পানি ব্যয় ৩৪০০ লিটার বা প্রায় ৯০০ গ্যালন পানি। সংখ্যাটা অতিরঞ্জিত শোনাচ্ছে, তাই একটু ভেঙ্গে বলি। একবার বাথটাবে গোসল করতে খরচ হয় ৮০ গ্যালন পানি। দশ মিনিট টানা শাওয়ার ছেড়ে রাখার পরিণতি হলো ৫০ গ্যালন পানি নালায় ভেসে যাওয়া। দশ মিনিট সময় ব্যয় করে থালা বাসন ধোয়া হলে তাতে পানি খরচ হয় ৩০ গ্যালন। ভাবছেন তাতেও তো সব এক করে ৯০০ গ্যালন হয় না! কিন্তু যেটা আপনি ভুলে বসেছেন তা হল আপনি শুধু পানি খরচ করে পানি ব্যবহার করছেন না। শুক্রবার সাগ্রহে যে গরুর মাংসের বাটি নিয়ে খেতে বসেন, সেই গরুর মাংস উৎপাদনে পাউন্ড প্রতি পানি ব্যয় ১৮৫০ গ্যালন। এক কাপ কফি ছাড়া দিন শুরু হয় না? এখন যদি হিসেব করতে বসি তাহলে দেখা যাবে ঐ এক কাপে যতটুকু পানি আটে, ঐ এক কাপ কফিতে পানি খরচ হয় তার চেয়ে অনেক বেশি। এক পাউন্ড রোস্টেড কফি তৈরি করতে ২৫০০ গ্যালন পানি প্রয়োজন হয়। আপনার প্রিয় চামড়ার জ্যাকেটটি তৈরি করতে খরচ হতে পারে প্রায় ১৬০০০ গ্যালন পানি!

দিনের প্রতিটি পর্যায় আপনি এমন কিছু শুকনো কাজ করে বেড়ান, যা সামষ্টিক ভাবে ধরণীকে পানিশুন্য করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। প্রথম পরিবর্তন প্রয়োজন আপনার অভ্যাসের। জেনে নিন কিভাবে আপনি পানির ক্ষয়রোধ, সংরক্ষণ, ও পুনঃব্যবহার করতে পারেন –

  • সচেতনভাবে পানির ব্যবহার কমিয়ে আনুন। যেখানে নিতান্তই পানি ব্যবহার প্রয়োজন নেই, সেখানে পানি খরচ করা থেকে বিরত থাকুন। পথঘাট যদি ঝাড়ু দেয়া যায়, তাহলে কেন পাইপ দিয়ে পানি ঢেলে অপচয় করবেন? অল্প কিছু ময়লা কাপড় ধুতে না দিয়ে যথেষ্ট জমিয়ে একসাথে ধুতে দেয়ার অভ্যাস তৈরি করুন। এই প্রক্রিয়ায় মাসে প্রায় শত শত গ্যালন বাঁচানো সম্ভব। একই ভাবে পরিমিত ব্যবহার করা উচিত ডিশওয়াশারও।
  • আপনি কি দাঁত মাজার সময় পানির কল ছেড়ে রাখেন? এই একটি অভ্যাস বদলিয়ে আপনি খুব সহজেই পানি বাঁচাতে পারেন। টুথব্রাশ, রেজর ধোয়ার সময়ও পানি বাঁচানো সম্ভব। ফলমূল কলের নিচে না ধুয়ে পানিতে ডুবিয়ে রাখুন। এতে পানি কম খরচ হবে।
  • একজন সাধারণ মানুষের পরিছন্ন থাকতে দিনপ্রতি ৫০ গ্যালন পানি কোনমতেই লাগে না। হযবরল ভাবে না করে একটু সচেতনভাবে গোসল করার চেষ্টা করুন। যদি প্রতি গোসলে দুই মিনিট সময়ও কমাতে পারেন, মাস শেষে তা জোড়া লেগে হবে ১৫০ গ্যালন সংরক্ষিত পানি। তবে সবচেয়ে ভালো হয় বালতির পানি ঢেলে গোসল করলে। এতে করে পানির পরিমান আগেই নির্দিষ্ট হয়ে যাবে। অযথাই গোসলে অতিরিক্ত পানি খরচ হবে না।
  • পানি সংরক্ষণের একটি বড় ধাপ পানি খরচের ব্যাপারে সচেতনতা। মোট পানি সরবরাহের সিংহভাগ ব্যয় হয় কৃষিকাজ ও পণ্য উৎপাদনে। পানি নিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করুন, এবং সংগৃহিত তথ্য ও পরামর্শগুলো নিজের জীবনে কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। প্রতিবার কফি না খেয়ে কফির পরিবর্তে এক কাপ চা পান করুন। দিনের অন্তত একটি বেলা নিরামিষ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। যে সকল পণ্য অতিরিক্ত পানি খরচের মাধ্যমে পরিবেশের উপর চাপ তৈরি করছে সেগুলোর ব্যবহার কমিয়ে আনুন।
  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করুন। ছাদ থাকলে ছোট একটা বাগান করতে পারেন। এতে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে চলে না গিয়ে কাজে লাগবে। ফল গাছ, শাক সবজি ইত্যাদির বাগান করলে সেই বাগান থেকেই আপনার এক বেলার নিরামিষ জুটে যাবে।
  • যদি বাগান করতে ভালো না লাগে, তাহলে বড় পাত্রে পানি জমিয়ে রাখতে পারেন। পরে সেই পানি তুলে ব্যবহার করতে পারবেন।
  • পানি পুনঃব্যবহার করুন। আপনার কাছে যা সুপেয় পানির সংজ্ঞা, গাছ ও অন্যান্য পশুপাখির জন্য তা না। তাহলে কেন একই পানি দিয়ে আপনি রান্না করছেন, গাছে পানি দিচ্ছেন, আবার টয়লেট ফ্লাশ করছেন? গ্লাসের পানিটুকু শেষ করতে ইচ্ছা না করলে পোষা প্রানীর পাত্রে অথবা গাছে ঢেলে দিন। বাতিল হয়ে যাওয়া বা পড়ে যাওয়া পানি দিয়ে ঘরের টুকিটাকি পরিছন্নতার কাজ সেরে ফেলতে পারেন। গাড়িটা লনের উপর রেখে ধুলে গাড়ি ধুতে ধুতে ঘাসে পানি দেয়া হয়ে যাবে। হোজ পাইপের বদলে বালতি ব্যবহার করুন।
  • আপনার দালানে যদি পানি রিসাইক্লিং না করা যায়, তবে সেটার ব্যবস্থা করুন। এক্ষেত্রে দালানে একটি অবকাঠামো যোগ করা হবে যা বাসাবাড়ির বিভিন্ন আউটলেট থেকে পানি সংগ্রহ করবে। এই ব্যবহৃত পানি এক দফা পরিশোধনের মধ্য দিয়ে গিয়ে জমবে আমাদের টয়লেট ফ্লাশ ও অন্যান্য সব ইনপুটে যেখানে সুপেয় পানির প্রয়োজন নেই। একই পানি আমাদের পক্ষে দুইবার ব্যবহার করা সম্ভব খুব সহজে।
  • পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করুন।

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিঃ

পানি সংরক্ষন শুধু কিছু কাজের সমন্বয় নয়, এটি একটি জীবনযাত্রা। অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন যে একজন মানুষের পক্ষে দিনের প্রতিটি বেলায় মনযোগ দিয়ে পানি রক্ষা করা খুবই কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এই সমস্যা সমাধানে এরই মধ্যে মার্কেটে এসেছে নানা রকম যন্ত্রপাতি যেগুলো কম ব্যয় করে একই সেবা দিয়ে থাকে। এই পণ্যগুলোতে বাজার ছেয়ে যাওয়ার বড় কারণ সাধারণ ক্রেতা ও ভোক্তারা পরিবেশবান্ধব পণ্যগুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। নিচে এমন কিছু পণ্য ও প্রযুক্তি সম্মন্ধে বলা হলো।

ডুয়াল ফ্লাশঃ বেশ অনেক বছর ধরেই এমন ফ্লাশ ট্যাংক পাওয়া যাচ্ছে যেটাতে পানি খরচের দুটো মাত্রা আছে। যখন যেমন প্রয়োজন সেই অনুযায়ী পানি ব্যবহার করতে পারবেন।

ট্যাপ এন্ড ফ্লাশঃ যদি একটি নতুন পানির ফ্লাশ বসানো সম্ভব না হয়, আপনি এই যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পারেন। এটি আপনাকে ডুয়াল ফ্লাশের সাথে সাথে আরও বাড়তি কিছু সুবিধা দিবে। দুইটি পৃথক ফ্লাশে কতটুকু সময় পানি যাবে তাও নির্ধারণ করে দেয়ার সুযোগ আছে এই গ্যাজেটটিতে। একবার দুটো ফ্লাশের সময় নির্দিষ্ট করে দিলে তারপর থেকে এটি নিজেই আপনার ফ্লাশের পানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করবে।

এর‍্যাটারঃ পানির কলে এর‍্যাটার লাগিয়ে নেয়া এখন পানি সংরক্ষণের একটি জনপ্রিয় উপায়। এটি বাতাসের সাহায্যে জলধারার গতি বাড়ায়। এতে করে পানি খুব জোরে বের হয়ে আসলেও, আদতে পানি বের হয় কম। পানির বেগ বেশি হলে যেকোন কিছু ধোয়া সহজ হয়। যদি কলে এর‍্যাটর ব্যবহার করা হয়, অল্প পানিই দ্রুত গতিতে বেড়িয়ে আসে। পানি অপচয় রোধ হয়।

ময়শ্চার সেন্সরঃ অধিকাংশ সময় দালানের পাইপলাইনে কোন ফুটো বা লিক থাকলে তা আমাদের জানতেই অনেক সময় পেরিয়ে যায়। পাইপলাইন যদি ময়শ্চার সেন্সরের পর্যবেক্ষণে থাকে, তাহলে যখনই কোথাও কোন ফুটো তৈরি হয়ে পানি বেড়িয়ে যাবে তা  আপনি সাথে সাথে জানতে পারবেন। যদি নির্দেশ দেয়া থাকে, তাহলে সে পানির সরবরাহও বন্ধ করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি মেরামত না করা পর্যন্ত অন্তত ফাটল দিয়ে পানি অপচয় হবে না।

খরচ পরিমাপকঃ লেখাটির এইটুক পর্যন্ত আসতে আসতে আপনি জেনে গেছেন গড়ে একজন সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক কাজে কি পরিমান পানি ব্যয় হয়। কিন্তু তাতে আপনি ব্যক্তিগতভাবে কতটুকু পানি খরচ করেন তা কিন্তু জানতে পারছেন না। একটি পরিমাপক যন্ত্র বা মিটার সেক্ষেত্রে আপনাকে সহায়তা করতে পারে। বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই বিদ্যুৎ বিলের মত পানির বিলেও মোট কত ইউনিট পানি খরচ হলো সেটা উল্লেখ করা হচ্ছে। এই মিটারটিই আপনাকে বলে দিবে আপনি অতিরিক্ত পানি ব্যয় করছেন কিনা, বা আপনার অভ্যাস পরিবর্তনের কারণে আপনি মাসে কত ইউনিট পানি সংরক্ষণ করছেন। কোন প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ে পানি ব্যয়ের এহেন পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখা অসম্ভব।

পানি সংরক্ষণ শুধু পানি জমানো বা দূষণ রোধ করা নয়। ব্যক্তি, সংস্থা, বা সরকার, এককভাবে কারো পক্ষেই এই তীব্র পানি সংকটের সুরাহা করা সম্ভব না। বিশ্বব্যাপী মানুষ সুপেয় পানির অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে, এবং এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রান পেতে প্রয়োজন একটি সার্বিক প্রয়াসের। যেদিন প্রতিটি স্তরের মানুষ পানির উপর তাদের জীবনযাত্রার প্রভাব উপলব্ধি করে নিজেদের বদলাতে উদ্যত হবে, যেদিন বিশ্বনেতারা কথা দিয়ে কথা রাখবেন এবং পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন, সেদিন সবার সামষ্টিক শ্রম ও সচেতনতার ফসল হিসেবে হয়তো ক্রমে এই অবস্থার উন্নতি হবে।  ব্লগের শুরুতে ২০৭৩ সালের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে সেটা পরিবর্তন করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Instagram

Unable to communicate with Instagram.

Archives